ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

ডাইং ডিক্লারেশন: মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও আইন।

01 Aug, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায়, বিশেষ করে হত্যা বা গুরুতর আঘাতের মামলায়, মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি বা ডাইং ডিক্লারেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যখন একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর কাছাকাছি এসে এমন কোনো তথ্য প্রদান করেন যা তার মৃত্যুর কারণ বা সংশ্লিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে আলোকপাত করে। সমাজের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, একজন মুমূর্ষু ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলেন না, কারণ তার আর কিছু হারানোর থাকে না। কিন্তু, আইনগতভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়শই ভুল বোঝাবুঝি দেখা যায়, যা সঠিক বিচার পেতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একজন আইনজীবী হিসেবে, আমি সাক্ষ্য আইনের আলোকে এই ভুল ধারণাগুলো নিরসন করে সঠিক তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করব।


মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি কী?

মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি বলতে সেই বিবৃতিকে বোঝায় যা একজন ব্যক্তি তার মৃত্যুর কারণ বা সেই ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রদান করেন, যার ফলস্বরূপ তার মৃত্যু হয়েছে। এই জবানবন্দি মৌখিক, লিখিত অথবা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমেও হতে পারে, যদি ব্যক্তি কথা বলতে অক্ষম হন। আইনের দৃষ্টিতে, এই ধরনের জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ ধরে নেওয়া হয় যে একজন ব্যক্তি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে মিথ্যা বলতে ইচ্ছুক হন না।

আইনগত ভিত্তি: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ধারা ৩২(১)

বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (Evidence Act, 1872)-এর ধারা ৩২(১) মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দির আইনি ভিত্তি প্রদান করে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো বিবৃতি প্রদান করেন যা তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে অথবা সেই ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য দেয়, যার ফলে তার মৃত্যু হয়েছে, তাহলে সেই বিবৃতি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণীয় হবে, এমনকি যদি বিবৃতি প্রদানকারী ব্যক্তি আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিতে সক্ষম না হন (যেমন, তার মৃত্যু হয়ে গেলে)।

"যখন কোনো বিবৃতি এমন ব্যক্তি কর্তৃক করা হয়, যিনি মারা গিয়াছেন অথবা যিনি পাওয়া যাইতেছেন না অথবা যিনি সাক্ষ্য দিতে অক্ষম অথবা যিনি অপরাধীর দ্বারা আটক রহিয়াছেন, তখন উক্ত বিবৃতি প্রাসঙ্গিক বলিয়া গণ্য হইবে, যদি ইহা মৃত্যুকালীন জবানবন্দি হয় এবং উহা যদি তাহার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে অথবা সেই ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে হয়, যাহার ফলে তাহার মৃত্যু হইয়াছে।" - সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২, ধারা ৩২(১)

এখানে লক্ষণীয় যে, জবানবন্দিটি অবশ্যই মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর দিকে পরিচালিত ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হতে হবে।

সাধারণ ভুল ধারণা ও প্রকৃত আইন

মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি নিয়ে সমাজে কয়েকটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্টতা প্রদান করা জরুরি:

  1. ১. সব মৃত্যুকালীন জবানবন্দিই কি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণীয়? - না। জবানবন্দিটি অবশ্যই মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে হতে হবে। যদি জবানবন্দিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বিষয় সম্পর্কে হয়, তবে তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণীয় হবে না।
  2. ২. এটি কি সবসময় চূড়ান্ত প্রমাণ? - মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি খুবই শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু এটি সবসময়ই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আদালত এর সত্যতা, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে এর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রমাণিক মূল্য নির্ধারণ করেন। অনেক সময় আদালত অন্যান্য সহায়ক প্রমাণের (corroboration) অভাব হলে এটি এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ নাও করতে পারেন।
  3. ৩. লিখিত জবানবন্দিই কি একমাত্র বৈধ? - না। মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি মৌখিক, লিখিত অথবা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমেও বৈধ হতে পারে। এমনকি শুধুমাত্র প্রশ্ন এবং মাথা নাড়াচাড়ার মাধ্যমেও জবানবন্দি গ্রহণ করা যেতে পারে, যদি ভিকটিম কথা বলতে অক্ষম হন। তবে, লিখিত বা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক রেকর্ডকৃত জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা সাধারণত বেশি হয়।
  4. ৪. পুলিশ কর্তৃক রেকর্ডকৃত জবানবন্দি বনাম ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক রেকর্ডকৃত জবানবন্দি। - পুলিশ কর্তৃক রেকর্ডকৃত জবানবন্দির চেয়ে একজন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ১৬৪ অনুযায়ী রেকর্ডকৃত জবানবন্দির আইনি মূল্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিরপেক্ষভাবে জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং এটি সঠিক প্রক্রিয়ায় রেকর্ড করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

আদালতে মুমূর্ষু জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা ও বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি

আদালত মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন এবং এর বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করেন:


বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন মামলায় এই নীতিগুলো পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যেখানে মুমূর্ষু জবানবন্দিকে এককভাবে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট বলে রায় দেওয়া হয়েছে, যদি আদালত এর সম্পূর্ণ সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

গুরুত্ব ও কার্যকারিতা

মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে যখন অন্য কোনো প্রত্যক্ষদর্শী প্রমাণ পাওয়া দুষ্কর হয়। এটি বিচার প্রক্রিয়ায় সত্য উদঘাটন এবং অপরাধীকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই জবানবন্দি অনেক সময় মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত সহায়ক হয়।

উপসংহার

মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি বা ডাইং ডিক্লারেশন একটি জটিল আইনি ধারণা যা সঠিক জ্ঞান ও ব্যাখ্যা দাবি করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। আশা করি এই আলোচনা মুমূর্ষু জবানবন্দি সম্পর্কে পাঠক সমাজের ভুল ধারণা দূর করতে এবং আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে সাহায্য করবে, যা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

চুক্তিপত্র ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে করলেই কি তা বৈধ? স্ট্যাম্প ডিউটির আসল নিয়ম।

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

আইনজীবী নিয়োগেই কি মামলা জেতা যায়? সত্য উন্মোচন

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

শুধু স্পর্শ নয়, অশালীন মন্তব্য কি যৌন হয়রানি? আইনি বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

মানহানি মামলা: কখন এবং কিভাবে করবেন – সম্পূর্ণ আইনি দিকনির্দেশনা-

বিস্তারিত পড়ুন
পারিবারিক আইন

দেনমোহর: স্ত্রীর মৌলিক অধিকার না কি কেবল বিচ্ছেদের সময়ের পাওনা?

বিস্তারিত পড়ুন