ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

শরিকি জমি বাইরের লোকের নিকট বিক্রি: অগ্রক্রয় মামলার A to Z গাইড

14 Sep, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশের ভূমি আইনে শরিকি জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখন একই খতিয়ানে একাধিক ব্যক্তির নাম থাকে, তখন সেই জমিকে শরিকি জমি বা সহ-মালিকানাধীন জমি বলা হয়। এই ধরনের জমির ক্ষেত্রে, সহ-শরিকদের একটি বিশেষ অধিকার থাকে, যা 'অগ্রক্রয়ের অধিকার' (Right of Pre-emption) নামে পরিচিত। যদি কোনো সহ-শরিক তার অংশবিশেষ কোনো বাইরের বা অচেনা লোকের নিকট বিক্রি করেন, তবে অন্য সহ-শরিকদের সে জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেনার আইনি অধিকার থাকে। এটি কেবল একটি অধিকার নয়, বরং জমির স্থায়িত্ব ও শরিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার একটি কার্যকর উপায়। এই অধিকার লঙ্ঘিত হলে, প্রতিকার হিসেবে অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে।


অগ্রক্রয়ের আইনগত ভিত্তি

অগ্রক্রয়ের অধিকার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি ধারণা যা মূলত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950) এর ধারা ৯৬ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়াও, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ (Transfer of Property Act, 1882) এর ধারা ৪৪ এবং দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908) এও সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী রয়েছে। তবে, শরিকি জমির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬ ধারাই প্রধান ভিত্তি।

"যদি কোনো সহ-শরিক প্রজাবর্গ বা সংলগ্ন ভূমি-মালিকগণ তাহাদের কোনো হোল্ডিং বা জমি বিক্রয় দ্বারা কোনো বহিরাগত ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করেন, তবে উক্ত হোল্ডিং এর অন্য কোনো সহ-শরিক বা সংলগ্ন ভূমি-মালিক বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার ৪ মাসের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে অগ্রক্রয় মামলা দায়ের করিতে পারিবে।" - রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০, ধারা ৯৬(১)।

কারা অগ্রক্রয় মামলা দায়ের করতে পারে?

অগ্রক্রয় মামলা দায়ের করার অধিকার মূলত নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের রয়েছে:


তবে, এই অধিকার তখনই প্রযোজ্য হবে যখন জমিটি কোনো বহিরাগত বা অ-শরিকের কাছে বিক্রি করা হয়। যদি সহ-শরিকদের নিজেদের মধ্যে জমি হস্তান্তর হয়, তবে এই অধিকার প্রযোজ্য হবে না।

অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের সময়সীমা

অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ধারা ৯৬(১) অনুযায়ী, বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার তারিখ থেকে চার মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। এই সময়সীমা কঠোরভাবে পালনীয় এবং এর ব্যতিক্রম সাধারণত গ্রহণীয় নয়। সময়সীমা অতিক্রম হয়ে গেলে অগ্রক্রয়ের অধিকার বাতিল হয়ে যায়।

অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের বিস্তারিত প্রক্রিয়া

অগ্রক্রয় মামলা একটি দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা। এর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক:

  1. বিক্রয় তথ্য সংগ্রহ - প্রথমে বিক্রীত জমির সকল তথ্য, যেমন - বিক্রয় দলিল নম্বর, দলিলের রেজিস্ট্রি তারিখ, জমির বিবরণ, ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম-ঠিকানা ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হবে।
  2. আবেদনপত্র বা আরজি প্রস্তুত - একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে অগ্রক্রয়ের জন্য আদালতে একটি আরজি বা আবেদনপত্র প্রস্তুত করতে হবে। এই আরজিতে সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং আইনগত ভিত্তি উল্লেখ করতে হবে।
  3. সংশ্লিষ্ট আদালতে আরজি দাখিল - আবেদনকারীর জমির অবস্থান অনুযায়ী এখতিয়ার সম্পন্ন দেওয়ানি আদালতে (সাধারণত সহকারী জজ আদালত) আরজি দাখিল করতে হবে।
  4. প্রয়োজনীয় অর্থ জমা - আরজি দাখিল করার সময় আদালতে বিক্রয় দলিলের উল্লিখিত সমুদয় বিক্রয় মূল্য এবং এর অতিরিক্ত ২৫% অর্থ statutory compensation (বিধিবদ্ধ ক্ষতিপূরণ) হিসেবে জমা দিতে হবে। এটি অগ্রক্রয় মামলার একটি অপরিহার্য শর্ত।
  5. নোটিশ জারি - আদালত আরজি গ্রহণ করার পর সাধারণত বিবাদীদের (অর্থাৎ ক্রেতা ও বিক্রেতা) উপর নোটিশ জারি করেন, যাতে তারা আদালতে হাজির হয়ে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারেন।
  6. শুনানি ও রায় - উভয় পক্ষের কাগজপত্র, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর আদালত মামলার গুণাগুণ বিচার করে রায় প্রদান করবেন। যদি আদালত আবেদনকারীর পক্ষে রায় দেন, তবে আবেদনকারী নির্ধারিত মূল্যে জমিটি ক্রয়ের অধিকার পাবেন।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

অগ্রক্রয় মামলা দায়েরের জন্য নিম্নলিখিত কাগজপত্রাদি সাধারণত প্রয়োজন হয়:


গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সতর্কতা

অগ্রক্রয় মামলা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হতে পারে। তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা আবশ্যক:


উপসংহার

শরিকি জমি বাইরের লোকের নিকট বিক্রি হলে অগ্রক্রয়ের অধিকার সহ-শরিকদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা কবচ। এটি শুধু আইনি অধিকারই নয়, বরং জমির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও সহ-শরিকদের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তায় এই অধিকার সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। আপনার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন এবং আইনি প্রতিকার লাভে দ্বিধা করবেন না।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

সিকিউরিটি চেক বনাম হাওলাতি চেক: আইনি প্রতিকারের পার্থক্য

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

জামিনদার হওয়ার আগে আইনি দায়বদ্ধতা: জেনে রাখা জরুরি

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

পাওনা টাকা আদায়: দেওয়ানি বনাম ফৌজদারি মামলা – সম্পূর্ণ গাইড

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

অছিয়তনামা, ওয়ারিশদের অধিকার এবং প্রবেট: আইনগত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

সাদা স্ট্যাম্প ও ফাঁকা চেকে স্বাক্ষরের আইনি ঝুঁকি: আপনার যা জানা জরুরি

বিস্তারিত পড়ুন