ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

সিকিউরিটি চেক বনাম হাওলাতি চেক: আইনি প্রতিকারের পার্থক্য

17 Sep, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনে চেক একটি বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। ঋণ পরিশোধ, চুক্তি সম্পন্ন করা বা ভবিষ্যতের কোনো বাধ্যবাধকতার নিশ্চয়তা প্রদানে চেকের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে, চেকে উল্লিখিত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে এর আইনি পরিণতি চেকের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। বিশেষত, সিকিউরিটি চেক (Security Cheque) এবং হাওলাতি চেক (Loan Cheque) বা ঋণের চেক নিয়ে প্রায়শই আইনি জটিলতা দেখা দেয়। এই দুই ধরনের চেকের আইনি প্রতিকারের পদ্ধতি এবং প্রয়োগে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, যা না জানার কারণে অনেক সময় বিবাদীরা হয়রানির শিকার হন অথবা সঠিক প্রতিকার পেতে ব্যর্থ হন। একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে, আমি এই নিবন্ধে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (The Negotiable Instruments Act, 1881) এর আলোকে এই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যসমূহ তুলে ধরব।


সিকিউরিটি চেক এবং হাওলাতি চেকের সংজ্ঞা

সিকিউরিটি চেক (Security Cheque)

সিকিউরিটি চেক হলো এমন একটি চেক যা কোনো নির্দিষ্ট ঋণ বা চুক্তির বিপরীতে তাৎক্ষণিক পরিশোধের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে উদ্ভূত হতে পারে এমন কোনো দায় বা বাধ্যবাধকতা পূরণের নিশ্চয়তা হিসেবে প্রদান করা হয়। যেমন, কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় বা কোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে গ্রাহক ভবিষ্যতের কিস্তি বা চুক্তির অন্য কোনো শর্ত ভঙ্গের আশঙ্কায় এই ধরনের চেক জমা দিতে পারেন। এই চেকের উদ্দেশ্য হলো, যদি গ্রহীতা তার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হন, তাহলে এই চেক ব্যবহার করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।

হাওলাতি চেক (Loan Cheque)

অন্যদিকে, হাওলাতি চেক বা ঋণের চেক সরাসরি একটি বিদ্যমান ও পরিশোধযোগ্য ঋণ বা দেনা পরিশোধের জন্য প্রদান করা হয়। অর্থাৎ, যখন একজন ব্যক্তি অন্য একজন ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন এবং সেই ঋণ পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ে একটি চেক প্রদান করেন, তখন সেটি হাওলাতি চেক হিসেবে গণ্য হয়। এই ধরনের চেক প্রদানের সময়ই একটি আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ বা দায় (legally enforceable debt or liability) বিদ্যমান থাকে।

নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এবং প্রাসঙ্গিক ধারা

বাংলাদেশে, চেকের ডিজঅনার বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়ে মূল আইন হলো নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১। এই আইনের ধারা ১৩৮ চেকের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ এবং এর প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করে। ধারা ১৩৮ এর বিধান অনুযায়ী, যদি কোনো চেক অপর্যাপ্ত তহবিলের (insufficient funds) কারণে বা ব্যাংক কর্তৃক 'পেমেন্ট স্টপ' (stop payment) করার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয় এবং সেটি কোনো আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়ে থাকে, তাহলে চেক প্রদানকারী ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন।

"Where any cheque drawn by a person on an account maintained by him with a banker for payment of any amount of money to another person from out of that account for the discharge, in whole or in part, of any legally enforceable debt or other liability, is returned by the bank unpaid, either because of the amount of money standing to the credit of that account is insufficient to honour the cheque or that it exceeds the amount arranged to be paid from that account by an agreement made with that bank, such person shall be deemed to have committed an offence..." - The Negotiable Instruments Act, 1881, Section 138

এই ধারার মূল শর্ত হলো, চেকটি 'আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ বা দায়' পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছে কিনা। এই শর্তটিই সিকিউরিটি চেক এবং হাওলাতি চেকের মধ্যে আইনি প্রতিকারের পার্থক্য নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

আইনি প্রতিকারের পার্থক্য

সিকিউরিটি চেকে আইনি প্রতিকার

সিকিউরিটি চেক ডিজঅনার হলে প্রতিকার পাওয়ার পথটি তুলনামূলকভাবে জটিল হতে পারে। এর কারণ হলো:

  1. ঋণের অস্তিত্ব প্রমাণ: সিকিউরিটি চেক প্রদানের সময় প্রায়শই কোনো তাৎক্ষণিক বা বিদ্যমান ঋণ থাকে না, বরং এটি ভবিষ্যতের কোনো দায় পূরণের নিশ্চয়তা মাত্র। ফলে, চেক ডিজঅনার হলে অভিযোগকারীকে এটি প্রমাণ করতে হয় যে, চেকটি যখন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছিল, তখন চেক প্রদানকারীর একটি আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ বা দায় ছিল যা পরিশোধ করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে, চেক প্রদানকারী এটি যুক্তি দেখাতে পারেন যে, চেকটি কেবল নিশ্চয়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই দায় এখনো সৃষ্টি হয়নি বা পরিশোধের সময় আসেনি।
  2. অপব্যবহার রোধ: আদালত সিকিউরিটি চেকের অপব্যবহার রোধে সতর্ক থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, আসল ঋণ বা চুক্তির শর্ত পূরণ না করেই বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সিকিউরিটি চেক জমা দিয়ে মামলা করা হয়। এক্ষেত্রে, অভিযোগকারীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, চেকটি একটি বৈধ ও আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণের বিপরীতে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই ঋণের অর্থ পরিশোধের সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
  3. উচ্চ আদালতের নির্দেশনা: বিভিন্ন উচ্চ আদালত সিকিউরিটি চেকের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, কেবলমাত্র সিকিউরিটি চেক প্রদান করা মানেই ধারা ১৩৮ এর অধীন অপরাধ সংঘটিত হওয়া নয়, যদি না চেকের মাধ্যমে পরিশোধযোগ্য ঋণ বা দায়টি পরিশোধের সময় হাজির করার মুহূর্তে আইনত বলবৎযোগ্য না হয়।

হাওলাতি চেকে আইনি প্রতিকার

হাওলাতি চেক বা ঋণের চেক ডিজঅনার হলে আইনি প্রতিকার পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ:

  1. ঋণের স্পষ্টতা: এই ধরনের চেক একটি বিদ্যমান এবং আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্য দেওয়া হয়। চেক প্রদানের সময়ই ঋণের অস্তিত্ব থাকে এবং চেকটি সেই ঋণ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  2. প্রমাণের দায়: ধারা ১৩৯ অনুযায়ী, যতক্ষণ না এর বিপরীত প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ এটি ধরে নেওয়া হয় যে, একটি চেক আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য কোনো ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছে। ফলে, হাওলাতি চেক ডিজঅনার হলে, চেকের গ্রহীতাকে (অভিযোগকারী) শুধুমাত্র এটি প্রমাণ করতে হয় যে চেকটি একটি বৈধ ঋণের বিপরীতে দেওয়া হয়েছিল। এরপর, চেকের প্রদানকারীর উপরই প্রমাণের দায় বর্তায় যে তার কোনো ঋণ ছিল না বা চেকটি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল।
  3. দ্রুত প্রতিকার: হাওলাতি চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে, ধারা ১৩৮ এর অধীনে ফৌজদারি মামলা দায়েরের মাধ্যমে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয় এবং দোষী প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। এর পাশাপাশি, অর্থঋণ আদালত আইন বা দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী দেওয়ানি মামলা দায়ের করে ঋণের টাকা আদায় করা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ও বিবেচ্য বিষয়সমূহ

উপরে উল্লিখিত আলোচনা থেকে সিকিউরিটি চেক ও হাওলাতি চেকের আইনি প্রতিকারের যে প্রধান পার্থক্যগুলো উঠে আসে, তা নিম্নরূপ:


আইনি পরামর্শ: আর্থিক লেনদেনে, বিশেষ করে চেক বিনিময়ের ক্ষেত্রে, সংশ্লিষ্ট চুক্তি বা অঙ্গীকারে চেকের উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা অত্যন্ত জরুরি। এটি ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়াতে সহায়তা করবে। ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়কেই চুক্তির শর্তাবলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে স্বাক্ষর করা উচিত।

উপসংহার

চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার পাওয়ার জন্য সিকিউরিটি চেক এবং হাওলাতি চেকের মধ্যকার পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও উভয় প্রকার চেকই নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর আওতাভুক্ত, তবে তাদের আইনি প্রয়োগ এবং প্রমাণের পদ্ধতি ভিন্ন। সঠিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি কেবল সময় ও অর্থ সাশ্রয়ই করবে না, বরং ন্যায্য প্রতিকার প্রাপ্তিতেও সহায়তা করবে। সুতরাং, আর্থিক লেনদেনে সর্বদা সতর্ক থাকুন এবং চেকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখুন।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

জামিনদার হওয়ার আগে আইনি দায়বদ্ধতা: জেনে রাখা জরুরি

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

শরিকি জমি বাইরের লোকের নিকট বিক্রি: অগ্রক্রয় মামলার A to Z গাইড

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

পাওনা টাকা আদায়: দেওয়ানি বনাম ফৌজদারি মামলা – সম্পূর্ণ গাইড

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

অছিয়তনামা, ওয়ারিশদের অধিকার এবং প্রবেট: আইনগত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

সাদা স্ট্যাম্প ও ফাঁকা চেকে স্বাক্ষরের আইনি ঝুঁকি: আপনার যা জানা জরুরি

বিস্তারিত পড়ুন