ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

অছিয়তনামা, ওয়ারিশদের অধিকার এবং প্রবেট: আইনগত বিশ্লেষণ

12 Sep, 2026 আসাদ টিম সিভিল আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

মানুষের জীবদ্দশায় অর্জিত সম্পত্তি মৃত্যুর পর কীভাবে বণ্টন হবে, তা নিয়ে প্রায়শই জটিলতা দেখা দেয়। অছিয়তনামা বা উইল হচ্ছে এমন একটি আইনি দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তির চূড়ান্ত সুরাহা করে যেতে পারেন। এটি একদিকে যেমন দাতার শেষ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়, তেমনি অন্যদিকে ওয়ারিশদের অধিকার এবং সম্পত্তির সুষ্ঠু হস্তান্তর নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থায়, বিশেষ করে উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ (The Succession Act, 1925) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইনে অছিয়তনামা এবং প্রবেট সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধান রয়েছে। একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে, আমরা অছিয়তনামা, ওয়ারিশদের অধিকার এবং প্রবেট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করব।


অছিয়তনামা কী এবং এর আইনগত ভিত্তি

আইনগতভাবে অছিয়তনামা বলতে এমন একটি দলিলকে বোঝায়, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (উইলকারী) তার মৃত্যুর পর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি কার কাছে কীভাবে যাবে, তা লিখিতভাবে নির্দেশ করে যান। এটি উইলকারীর মৃত্যুর পরই কার্যকর হয় এবং যে কোনো সময় প্রত্যাহার বা পরিবর্তন করা যায়।

আইনগত ভিত্তি:

  1. মুসলিম আইন: মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, একজন মুসলিম তার সম্পত্তির কেবল এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অছিয়ত করতে পারেন। অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (শরিয়াহ্ আইন) অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে। যদি উইলকারী তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি অছিয়ত করতে চান, তবে সকল ওয়ারিশের সম্মতি প্রয়োজন। এই সম্মতি উইলকারীর মৃত্যুর পর দেওয়া যেতে পারে।
  2. উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ (The Succession Act, 1925): এই আইনটি মূলত অমুসলিমদের (যেমন: হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ ইত্যাদি) অছিয়তনামার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই আইনে সম্পত্তির পরিমাণ নির্ধারণে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই; একজন ব্যক্তি তার সমস্ত সম্পত্তি অছিয়ত করতে পারেন, তবে তা আইনানুগ পদ্ধতিতে হতে হবে।
"Every sane person not being a minor may by will dispose of his property." – ধারা ৫৯, উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫।

অছিয়তনামা প্রণয়নের শর্তাবলী

একটি অছিয়তকে আইনগতভাবে বৈধ এবং কার্যকর করতে কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়:


ওয়ারিশদের অধিকার ও অছিয়তের সীমাবদ্ধতা

অছিয়তনামা দাতার শেষ ইচ্ছা হলেও, ওয়ারিশদের অধিকার সুরক্ষার জন্য আইনে কিছু বিধান রাখা হয়েছে:

মুসলিম ওয়ারিশদের বিশেষ অধিকার:

মুসলিম আইনে ওয়ারিশদের (যেমন: পুত্র, কন্যা, স্ত্রী, স্বামী, পিতা, মাতা) নির্দিষ্ট শেয়ার রয়েছে। একজন মুসলিম তার মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি অছিয়ত করতে পারেন না। যদি উইলকারী তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাউকে অছিয়ত করতে চান, তবে সকল ওয়ারিশের স্বেচ্ছামূলক সম্মতি অত্যাবশ্যক। যদি কোনো ওয়ারিশ সম্মতি না দেন, তবে উইলকারীর মৃত্যুর পর ওই অছিয়ত এক-তৃতীয়াংশের অতিরিক্ত অংশের জন্য বাতিল বলে গণ্য হবে।

অছিয়তকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার:

ওয়ারিশগণ যদি মনে করেন যে অছিয়তনামাটি বৈধভাবে সম্পন্ন হয়নি বা তাতে কোনো ত্রুটি রয়েছে, তবে তারা আদালতে এটিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাব্য কারণগুলো হল:

  1. অসক্ষমতা: উইলকারী অছিয়ত করার সময় সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী ছিলেন না।
  2. প্রতারণা বা জবরদস্তি: অছিয়তনামা প্রতারণা, অবৈধ প্রভাব বা জবরদস্তি করে করানো হয়েছে।
  3. অযথাযথ সম্পাদন: আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাক্ষীর স্বাক্ষর বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করা হয়নি।
  4. জালিয়াতি: অছিয়তনামাটি জাল।
  5. আইনের লঙ্ঘন: মুসলিম আইনে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি অছিয়ত করা হয়েছে এবং ওয়ারিশদের সম্মতি নেই।

প্রবেট: অছিয়তনামার আইনগত প্রমাণ

প্রবেট হল আদালতের একটি আদেশ, যা অছিয়তকে আইনগতভাবে বৈধ ঘোষণা করে এবং উইলকারীর সম্পত্তি বণ্টনের জন্য অছিয়তনামায় উল্লিখিত এক্সিকিউটরকে (নির্বাহক) ক্ষমতা প্রদান করে। এটি উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ এর ধারা ২২২ থেকে ধারা ২৯৯ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।

প্রবেটের প্রয়োজনীয়তা:

  1. অমুসলিমদের জন্য: ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ শহরের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ব্যক্তি যদি স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির অছিয়ত করেন, তবে প্রবেট গ্রহণ বাধ্যতামূলক। একই সাথে, যদি স্থাবর সম্পত্তি ওই শহরগুলির বাইরেও হয় এবং অছিয়তটি উল্লেখিত শহরের মধ্যে তৈরি হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও প্রবেট আবশ্যক।
  2. মুসলিমদের জন্য: মুসলিমদের ক্ষেত্রে অছিয়ত কার্যকর করার জন্য প্রবেট বাধ্যতামূলক নয়। তবে, যদি অছিয়তের বৈধতা নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকে বা এক্সিকিউটর আইনি সুরক্ষা চান, অথবা যদি স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর জড়িত থাকে, তাহলে প্রবেট গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রবেট এক্সিকিউটরের ক্ষমতা এবং অছিয়তের বৈধতা নিশ্চিত করে।

প্রবেট পাওয়ার প্রক্রিয়া:

এক্সিকিউটর বা তার পক্ষে আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতে অছিয়ত সহ প্রবেটের জন্য আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি পরীক্ষা করে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষদের (যেমন ওয়ারিশগণ) নোটিশ প্রদান করে। কোনো আপত্তি না থাকলে এবং অছিয়তটি বৈধ প্রমাণিত হলে, আদালত প্রবেট মঞ্জুর করে।

অছিয়তনামা কার্যকর করার প্রক্রিয়া

অছিয়তনামা কার্যকর করার দায়িত্ব সাধারণত অছিয়তনামায় উল্লিখিত এক্সিকিউটরের। এক্সিকিউটর যদি না থাকে বা কাজ করতে অস্বীকার করে, তবে প্রশাসনের চিঠি (Letters of Administration) নিতে হয়।


উপসংহার

অছিয়তনামা একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার যা একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির সুপরিকল্পিত বণ্টন নিশ্চিত করে। ওয়ারিশদের অধিকার এবং প্রবেট সংক্রান্ত আইনগত বিধানগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অপরিহার্য। অছিয়ত প্রণয়নে যেমন উইলকারীকে তার ইচ্ছা প্রকাশে সতর্ক থাকতে হয়, তেমনি ওয়ারিশদেরও তাদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যেকোনো আইনি জটিলতা এড়াতে এবং অছিয়তনামাকে কার্যকর করতে আইনি সহায়তা নেওয়া সর্বদা কাম্য।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

সিকিউরিটি চেক বনাম হাওলাতি চেক: আইনি প্রতিকারের পার্থক্য

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

জামিনদার হওয়ার আগে আইনি দায়বদ্ধতা: জেনে রাখা জরুরি

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

শরিকি জমি বাইরের লোকের নিকট বিক্রি: অগ্রক্রয় মামলার A to Z গাইড

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

পাওনা টাকা আদায়: দেওয়ানি বনাম ফৌজদারি মামলা – সম্পূর্ণ গাইড

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

সাদা স্ট্যাম্প ও ফাঁকা চেকে স্বাক্ষরের আইনি ঝুঁকি: আপনার যা জানা জরুরি

বিস্তারিত পড়ুন