ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

রিমান্ড কী? রিমান্ডে আসামির আইনী অধিকারসমূহ: বাংলাদেশের আইন পর্যালোচনা-

21 Jul, 2026 আসাদ টিম ফৌজদারি আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ‘রিমান্ড’ শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রায়শই সংবাদ শিরোনামে দেখা যায়। এটি এমন একটি আইনী প্রক্রিয়া যেখানে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অথবা আরও তদন্তের স্বার্থে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াটি একদিকে যেমন অপরাধ দমনে সহায়তা করে, তেমনি অন্যদিকে এর অপব্যবহারের সম্ভাবনাও থাকে। তাই রিমান্ড কী, এর আইনী ভিত্তি কী এবং রিমান্ডে থাকাকালীন একজন আসামির কী কী আইনী অধিকার রয়েছে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। এই আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রিমান্ড এবং আসামির অধিকারসমূহ বিশদভাবে পর্যালোচনা করব।


রিমান্ড কী?

আভিধানিকভাবে 'রিমান্ড' (Remand) অর্থ হচ্ছে 'ফিরিয়ে দেওয়া' বা 'পুনরায় পাঠানো'। ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায়, যখন কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় এবং পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে মনে করে যে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন, তখন তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন। আদালত যদি মনে করেন যে আসামিকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি এবং তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শেষ করা সম্ভব নয়, তবে আদালত ওই আসামিকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পুলিশ হেফাজতে অথবা কারা হেফাজতে পাঠিয়ে দেন। এই প্রক্রিয়াই সাধারণত 'রিমান্ড' নামে পরিচিত। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অপরাধের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করা এবং প্রমাণ সংগ্রহে সহায়তা করা।

রিমান্ডের আইনী ভিত্তি-

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যক্রমে রিমান্ডের বিধান মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure, 1898)-এর ধারা ১৬৭ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ধারা অনুযায়ী:

"যখন কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব না হয়, তখন তদন্তকারী কর্মকর্তা কারণ উল্লেখ করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আসামিকে আরও বেশি সময় পুলিশ হেফাজতে রাখার আবেদন করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট যদি যুক্তিসঙ্গত মনে করেন, তবে তিনি আসামিকে অনধিক ১৫ দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে (পুলিশ রিমান্ড) অথবা কারা হেফাজতে (জুডিশিয়াল রিমান্ড) প্রেরণের আদেশ দিতে পারেন। তবে, কোনো অবস্থায়ই পুলিশ রিমান্ডের মোট মেয়াদ ১৫ দিনের বেশি হতে পারবে না।"

এখানে উল্লেখ্য, ধারা ১৬৭ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখা যেতে পারে, তবে আদালত একবারে সব ১৫ দিন না দিয়ে পর্যায়ক্রমে কম সময়ের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারেন। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এবং তদন্তের প্রয়োজনে এটি একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়।

রিমান্ডে আসামির আইনী অধিকারসমূহ-

রিমান্ডের ক্ষমতা তদন্তের জন্য অপরিহার্য হলেও, আইনের অপব্যবহার রোধ এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য রিমান্ডে থাকাকালীন আসামির বেশ কিছু আইনী অধিকার রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা এই অধিকারগুলো সুরক্ষিত। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ অধিকারসমূহ তুলে ধরা হলো:

  1. আইনজীবীর সাথে পরামর্শের অধিকার - সংবিধানের ৩৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে তার পছন্দের একজন আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। রিমান্ডে থাকাকালীনও এই অধিকার বলবৎ থাকে।
  2. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষার অধিকার - সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ এবং নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। রিমান্ডে থাকাকালীন আসামিকে কোনো প্রকার ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রলোভন বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্পূর্ণ বেআইনী। যদি এমন কোনো অভিযোগ ওঠে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শাস্তির আওতায় আসবেন।
  3. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার অধিকার - ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ৬১ এবং ধারা ১৬৭ অনুযায়ী, গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। এর মধ্যে যাতায়াতের সময় অন্তর্ভুক্ত নয়। এই সময়সীমার পরে বিনা আদেশে কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে রাখা বেআইনী।
  4. চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার - রিমান্ডে থাকাকালীন আসামির অসুস্থতা দেখা দিলে বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে, তাকে যথাযথ চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি নিশ্চিত করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় ও নির্দেশনাতেও এই বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
  5. পরিবারের সাথে যোগাযোগের অধিকার - যদিও আইনে সরাসরি এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারা নেই, তবে মানবাধিকার এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির অংশ হিসেবে আসামির পরিবারকে তার গ্রেফতার ও অবস্থান সম্পর্কে জানানোর এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে তাদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
  6. স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের অধিকার - যদি আসামি স্বেচ্ছায় কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চায়, তবে তা অবশ্যই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ১৬৪ অনুযায়ী রেকর্ড করতে হবে। পুলিশি হেফাজতে প্রদত্ত কোনো স্বীকারোক্তি সাধারণত আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।
  7. শারীরিক পরীক্ষার অধিকার - যদি আসামি দাবি করেন যে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাহলে তাকে অনতিবিলম্বে সরকারি ডাক্তার দ্বারা শারীরিক পরীক্ষা করার অধিকার রয়েছে, যা নির্যাতনের প্রমাণ নথিভুক্ত করতে সহায়তা করবে।
  8. রিমান্ড আদেশ বাতিলের জন্য আবেদন করার অধিকার - আসামি বা তার আইনজীবী যদি মনে করেন যে রিমান্ড আদেশ আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয়, তবে উচ্চতর আদালতে এর বিরুদ্ধে আবেদন করার অধিকার রয়েছে।

উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রিমান্ডের অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছেন। বিশেষত, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST) বনাম বাংলাদেশ মামলার রায় (যা ৫৬ ডিএলআর (২০০৪) ৫৫৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত) এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী রায়। এই রায়ে হাইকোর্ট কিছু নির্দেশিকা দিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:


উপসংহার

রিমান্ড ফৌজদারি তদন্তের একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হলেও, এর ব্যবহার অবশ্যই আইনের সুনির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে হতে হবে। আসামির আইনী ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। সচেতন নাগরিক হিসেবে এবং আইন পেশার একজন সদস্য হিসেবে, রিমান্ডে আসামির অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ও তা নিশ্চিত করার জন্য সচেষ্ট থাকা উচিত। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

চুক্তিপত্র ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে করলেই কি তা বৈধ? স্ট্যাম্প ডিউটির আসল নিয়ম।

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

আইনজীবী নিয়োগেই কি মামলা জেতা যায়? সত্য উন্মোচন

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

শুধু স্পর্শ নয়, অশালীন মন্তব্য কি যৌন হয়রানি? আইনি বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ডাইং ডিক্লারেশন: মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও আইন।

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

মানহানি মামলা: কখন এবং কিভাবে করবেন – সম্পূর্ণ আইনি দিকনির্দেশনা-

বিস্তারিত পড়ুন