ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

বৈবাহিক জীবনে পরকীয়া: আইনি পরিণতি ও প্রতিকার !

23 Jul, 2026 আসাদ টিম ফৌজদারি আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বৈবাহিক সম্পর্ক পবিত্রতা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। যখন এই সম্পর্কে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি অনুপ্রবেশ করে, তখন তাকে আমরা পরকীয়া বা ব্যভিচার হিসেবে চিহ্নিত করি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরকীয়ার ধারণা এবং এর আইনি পরিণতি নিয়ে সমাজে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা ও বিতর্ক বিদ্যমান। পূর্বে পরকীয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও, সাম্প্রতিক আইনি সংস্কারের ফলে এর পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে, আমি এই প্রবন্ধে পরকীয়ার আইনি দিক, এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এবং বর্তমানে এর ফলে উদ্ভূত পারিবারিক প্রতিকারসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।


দণ্ডবিধির ধারা ৪৯৭: এক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৯৭ একসময় পরকীয়া বা ব্যভিচারকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করত। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অপর কোনো বিবাহিত মহিলার সাথে তার স্বামীর সম্মতি ব্যতীত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করত, তবে সেই পুরুষকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান ছিল। তবে, এই ধারার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এটি শুধুমাত্র পুরুষের অপরাধ হিসেবে গণ্য করত এবং পরকীয়ায় জড়িত মহিলাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দিত।

"Whoever has sexual intercourse with a person who is and whom he knows or has reason to believe to be the wife of another man, without the consent or connivance of that man, such sexual intercourse not amounting to the offence of rape, is guilty of the offence of adultery..."

এই ধারাটি লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হওয়ায় সমাজে এর বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। এটি নারীর সমানাধিকারের পরিপন্থী ছিল কারণ এটি নারীকে পুরুষের সম্পত্তির মতো বিবেচনা করত এবং পুরুষকে পরকীয়ার জন্য একতরফাভাবে দায়ী করত।

পরকীয়া ও এর অসাংবিধানিক ঘোষণা: একটি যুগান্তকারী রায়

একটি ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে, ২০২৩ সালের ১৪ই মার্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দণ্ডবিধির ধারা ৪৯৭-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। এই রায়ের ফলে, বাংলাদেশে পরকীয়া আর কোনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, এই ধারাটি সংবিধানের ২৭, ২৮(১) এবং ৩২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যা আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতা, লিঙ্গ নির্বিশেষে বৈষম্যহীনতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই রায় বাংলাদেশে নারী অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পারিবারিক আইনে পরকীয়া: বিবাহ বিচ্ছেদ ও অন্যান্য প্রতিকার

যদিও পরকীয়া এখন ফৌজদারি অপরাধ নয়, তবে পারিবারিক আইনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিবাহ বিচ্ছেদ বা দাম্পত্য সম্পর্কচ্ছেদের একটি শক্তিশালী কারণ হিসেবে পরকীয়া সবসময়ই বৈধ। বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনে পরকীয়ার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান রয়েছে:

  1. মুসলিম আইন: মুসলিম বিবাহ ও তালাক সম্পর্কিত আইনে, স্বামী বা স্ত্রী উভয়েই পরকীয়ার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।
  2. হিন্দু আইন: হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৬১ (যদি প্রযোজ্য হয়) বা প্রচলিত হিন্দু শাস্ত্রীয় মতে, পরকীয়া বিবাহ বিচ্ছেদের একটি কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ ও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট একটি আইন থাকলেও, হিন্দু নারীদের জন্য বিবাহ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া মুসলিম আইনের মতো সহজলভ্য নয়। তবে, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের সুযোগ তৈরি হয়েছে যেখানে পরকীয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাউন্ড হতে পারে।
  3. খোরপোষ ও সন্তানের হেফাজত: পরকীয়ার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে খোরপোষ (ভরণপোষণ) এবং সন্তানের হেফাজতের বিষয়েও আইনি সিদ্ধান্ত নিতে হয়।



পরকীয়ার সামাজিক ও মানসিক প্রভাব

আইনি পরিণতি ছাড়াও, পরকীয়ার সামাজিক এবং মানসিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি দম্পতিদের মধ্যে গভীর মানসিক আঘাত, অবিশ্বাস, এবং সম্পর্কের ভাঙন সৃষ্টি করে। সন্তানেরা এর দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাদের ভবিষ্যতের উপর নেতিবাচক ছায়া ফেলে। সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং নৈতিকতার প্রশ্নও এর ফলে প্রকট হয়ে ওঠে।

উপসংহার

পরকীয়া বাংলাদেশের আইনে আর ফৌজদারি অপরাধ না হলেও, এটি পারিবারিক জীবনে একটি গুরুতর সংকট সৃষ্টি করে। এর ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ, খোরপোষ এবং সন্তান হেফাজতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়গুলি জড়িত থাকে। তাই, বৈবাহিক জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়লে সঠিক আইনি পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে আপনার অধিকার ও করণীয় সম্পর্কে জেনে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে আপনি আপনার সমস্যা সমাধান করতে পারেন এবং একটি নতুন জীবন শুরু করার পথ প্রশস্ত করতে পারেন।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

বিয়ে না করে পালানো: আইনি পরিণতি ও দণ্ডবিধির বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

চুক্তিপত্র ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে করলেই কি তা বৈধ? স্ট্যাম্প ডিউটির আসল নিয়ম।

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

আইনজীবী নিয়োগেই কি মামলা জেতা যায়? সত্য উন্মোচন

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

শুধু স্পর্শ নয়, অশালীন মন্তব্য কি যৌন হয়রানি? আইনি বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ডাইং ডিক্লারেশন: মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও আইন।

বিস্তারিত পড়ুন