ADVOCATE
ABDUR RAHMAN ASAD

TANGAIL JUDGE COURT OF BANGLADESH

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ – বাস্তবে কতটা কার্যকর ও চ্যালেঞ্জসমূহ !

14 Jul, 2026 আসাদ টিম পারিবারিক আইন

ভূমিকা ও পটভূমি

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ব্যাধি, যা নারী ও শিশুর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে এবং তাদের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তোলে। এই সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করেছে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭। এই আইনটির মূল উদ্দেশ্য হলো ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের এবং ২১ বছরের নিচে ছেলেদের বিবাহ বন্ধ করা। কিন্তু আইন প্রণয়নের পর প্রায় ছয় বছর পার হলেও, সমাজে বাল্যবিবাহের হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমেনি। এই নিবন্ধে আমরা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এর বিধানসমূহ, এর বাস্তব কার্যকারিতা এবং এর প্রয়োগে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে, আমি আইনের প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করে এর কার্যকর প্রয়োগের পথ বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করব।


বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এর মূল বিধানসমূহ

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট বিধান নিয়ে এসেছে। আইনের প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:

  1. বিবাহের বয়স (ধারা ২) - আইনে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, বিবাহযোগ্য পুরুষের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর এবং নারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। এর নিচে বিবাহকে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য করা হবে।
  2. বাল্যবিবাহের শাস্তি (ধারা ৬) - কোনো ব্যক্তি বাল্যবিবাহ করলে তিনি অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
  3. বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করার শাস্তি (ধারা ৭) - বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করার জন্য যে সকল ব্যক্তি জড়িত থাকবেন, যেমন – কাজি, পুরোহিত, নিকাহ রেজিস্টার বা অন্য কোনো ব্যক্তি, তাদের অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
  4. বাল্যবিবাহে ইন্ধন, প্ররোচনা বা অনুমোদন (ধারা ৮) - যে ব্যক্তি বাল্যবিবাহে ইন্ধন যোগান, প্ররোচনা দেন বা অনুমোদন করেন, তিনিও অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
  5. বাল্যবিবাহ বাতিল (ধারা ১২) - বাল্যবিবাহ সংঘটিত হলে, বিবাহিত অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আবেদন করে বিবাহ বাতিলের জন্য আদেশ চাইতে পারেন।

তবে, এই আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সমালোচিত বিধান হলো ধারা ১৯, যা ‘বিশেষ বিধান’ নামে পরিচিত। এই ধারায় বলা হয়েছে, “এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তি সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করিয়া, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হইলে উহা অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।” এই বিশেষ বিধানটি আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বলে অনেকে মনে করেন।

আইনের প্রয়োগে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী আইন হওয়া সত্ত্বেও, এর বাস্তব প্রয়োগে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়।


“মানবাধিকার কর্মী এবং মহিলা অধিকার সংস্থাগুলো মনে করে যে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এর ধারা ১৯ বাল্যবিবাহকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার একটি পথ তৈরি করে, যা আইনের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত।”

আইন কার্যকর করার কৌশল ও সুপারিশমালা

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ কে বাস্তবে কার্যকর করতে হলে আইনের দুর্বলতা দূর করা এবং সামগ্রিক সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। নিচে কিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হলো:

  1. ধারা ১৯ বাতিল বা সংশোধন: আইনের ধারা ১৯ এর বিতর্কিত ‘বিশেষ বিধান’ বাতিল করা বা এর পরিধি অত্যন্ত সীমিত করা উচিত, যাতে এর কোনো অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।
  2. ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি: গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বাল্যবিবাহের কুফল এবং আইনি শাস্তির বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।
  3. অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা গেলে বাল্যবিবাহের প্রবণতা হ্রাস পাবে।
  4. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি: পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের সদস্যদের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সম্পর্কে আরও প্রশিক্ষিত করা এবং তাদের নৈতিক মান উন্নত করা প্রয়োজন।
  5. অভিযোগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ: বাল্যবিবাহের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষ নির্ভয়ে তথ্য দিতে পারে।
  6. স্থানীয় সরকারের সক্রিয় ভূমিকা: ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি।




উপসংহার

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ একটি শক্তিশালী আইন হিসেবে বাল্যবিবাহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এর বাস্তব কার্যকারিতা নির্ভর করে এর নির্ভুল প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর। কেবল আইনের বিধান তৈরি করলেই হবে না, বরং আইনের পেছনের দর্শন এবং এর উদ্দেশ্যকে সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সুশীল সমাজ, এনজিও, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে এই সামাজিক অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে। বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা উভয়ই অপরিহার্য।

পেশাদার আইনি পরামর্শ প্রয়োজন?

যেকোনো দেওয়ানি, ফৌজদারি, জমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা হাইকোর্টের রিট পিটিশনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলুন এডভোকেট আব্দুর রহমান আসাদের সাথে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন WhatsApp করুন কল করুন

সাম্প্রতিক অন্যান্য আইনি পোস্ট

সিভিল আইন

বিয়ে না করে পালানো: আইনি পরিণতি ও দণ্ডবিধির বিস্তারিত বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

চুক্তিপত্র ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে করলেই কি তা বৈধ? স্ট্যাম্প ডিউটির আসল নিয়ম।

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

আইনজীবী নিয়োগেই কি মামলা জেতা যায়? সত্য উন্মোচন

বিস্তারিত পড়ুন
ফৌজদারি আইন

শুধু স্পর্শ নয়, অশালীন মন্তব্য কি যৌন হয়রানি? আইনি বিশ্লেষণ

বিস্তারিত পড়ুন
সিভিল আইন

ডাইং ডিক্লারেশন: মুমূর্ষু ব্যক্তির জবানবন্দি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও আইন।

বিস্তারিত পড়ুন